বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৩:২৫ পূর্বাহ্ন
বেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম : বিশাল হলরুমে ৩২টি টেবিল। প্রতি টেবিল লোকজনে ঠাসা। কোলাহল চলছে। হাতে সবার মুঠো মুঠো টাকা। যে যেভাবে পারছেন চেয়ারে বসা কর্মকর্তাকে দিচ্ছেন। আর জটলা কাগজ ঠেলে বের হচ্ছে প্রয়োজনীয় কাগজ। চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস যেন এমনই এক ‘ঘুষের মেলা’। চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে সরেজমিনে অনুসন্ধান চালানোর সময় প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেনের অসংখ্য দৃশ্যের দেখা মেলে। কাস্টমস হাউসের এক থেকে তিন তলা পর্যন্ত প্রতিটি কক্ষের প্রায় একই দৃশ্য। বিশেষ করে আমদানি শাখায় যেন চলে ঘুষের মহোৎসব। অনুসন্ধানে জানা যায়, আমদানি করা পণ্য খালাস করতে ২৫ ঘাটে মোটা অঙ্কের ঘুষ গুনতে হয়। আর এতে প্রতিদিন অবৈধ লেনদেন হচ্ছে কয়েক কোটি টাকা। ভুক্তভোগীরা বলছেন, ঘুষ ছাড়া কাস্টমস হাউসে কোনো কাজ হয় না। ঘুষ নেই, কাগজে স্বাক্ষরও নেই। পণ্য থাকবে পণ্যের জায়গায়। ঘুষ ছাড়া পণ্য খালাসের চিন্তা করাও যেন এখানে অপরাধ। আগে পণ্য খালাসে ৬২ ঘাটে ঘুষ দিতে হতো। কিন্তু অনিয়ম, দুর্নীতি রোধে অটোমেশিনের প্রচলন করা হলে অর্ধেকের বেশি টেবিল কমেছে।
৬২ টেবিল কমে এখন ২৫-এ নেমেছে। টেবিল কমলেও কমেনি ঘুষের অঙ্ক। একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি আক্ষেপ করে জানান, তার গার্মেন্ট কারখানার জন্য আমদানি করা কাপড়ের চালান ছাড় করাতে ১০ হাজার টাকা ঘুষ না দেওয়ার সন্দেহ হচ্ছে। তাই সরেজমিন মাল দেখতে যাবে বলে ফাইল আটকে রেখে ১৫ দিনে অন্তত দুই লাখ টাকা ক্ষতির সম্মুখীন করেছে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে এভাবে জিম্মি হয়ে আছেন দেশের আমদানি-রপ্তানিকারকরা। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী থেকে শিল্প কারখানার কাঁচামাল বা ক্যাপিটাল মেশিনারিজ যা-ই আমদানি হোক না কেন তা শুল্কায়ন করে বন্দর থেকে ডেলিভারি নিতে হয়রানি, ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন না এমন নজির এখানে কম। প্রকৃত ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা এ ধরনের হয়রানির কারণে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়লেও অসাধু ফড়িয়া চক্র এখানে দুর্নীতিবাজদের সহায়তায় শত শত কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির মাধ্যমে রাতারাতি বনে যাচ্ছে বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক। আগে থেকে বনিবনা থাকলে পণ্য চালান খালাস দ্রুত হবে। তা না করলে একের পর এক আইনি মারপ্যাঁচ দেখিয়ে আমদানি চালান খালাসকে বিলম্বিত করে দেবে। এটিই যেন অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে। চাহিদামতো ঘুষ না দিলে সন্দেহ হচ্ছে বলে পণ্য চালান আটকে রেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে সময়ক্ষেপণ করার মাধ্যমে আর্থিক ক্ষতি শুধু নয়, বহু কারখানায় কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন পর্যন্ত বন্ধ থাকে।
দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে কাস্টমসের কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের কমিশনার বলেন, চট্টগ্রাম কাস্টমসে আমদানি-রপ্তানি মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজার বিল অব এন্ট্রি হয়। এর মধ্যে আমদানিতে ১ হাজার আর রপ্তানিতে ৩ হাজার। আমদানিতে গড়ে প্রতিদিন তিন ভাগ বা ৩০টি বিল অব এন্ট্রিতে অনিয়ম পাওয়া যায়। এসব অনিয়মের সঙ্গে আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও কাস্টমসের লোকজন জড়িত থাকে বলে বলে স্বীকার করেছেন তিনি। যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায় তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। হয়রানি, ভোগান্তির কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, সিস্টেম উন্নত করে আরও দ্রুত যাতে সার্ভিস দেওয়া যায় সে চেষ্টা করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম কাস্টমস সূত্র জানায়, গত এক বছরে অবৈধ লেনদেন ও অনিয়মে জড়িত এমন ২১ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সে ব্যবস্থা শুধু ‘কারণ দর্শাও নোটিশ’-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নোটিশের জবাব দিলেই সব অপরাধ মাফ। অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে চলছে বহুমুখী অনিয়ম।
পণ্য শুল্কায়নে পদে পদে হয়রানি এখানে নৈমিত্তিক ঘটনা। পণ্য আমদানির পর থেকে শুরু করে খালাস পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় আমদানিকারকদের পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি। আমদানিকারকরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে একাধিকবার অভিযোগ করলেও কোনো সুফল মেলেনি। বন্ধ হয়নি ঘাটে ঘাটে ঘুষ, অনিয়ম ও দুর্নীতি। পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে বহুমুখী সমস্যা নিরসনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। কাস্টমসের কর্মকাণ্ড গতিশীল, স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত করে আমদানিকারকদের দুর্ভোগ-দুর্দশা লাঘবের কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যায়নি। এ ছাড়া বহিরাগতদের দাপটে সন্ত্রস্ত থাকতে হচ্ছে সবাইকে। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে কাস্টমসে জনবল নিয়োগ বন্ধ। ফলে পিয়ন, দারোয়ান, খালাসিরা হয়ে গেছেন রাজস্ব কর্মকর্তা, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কাস্টমসের সার্বিক কর্মকাণ্ডে। সম্প্রতি বিভিন্ন গার্মেন্টের নামে পণ্য চালান আনছে কাস্টমসের সংঘবদ্ধ একটি চক্র। কখন কার প্রতিষ্ঠানের নামে এ চক্র পণ্য এনে ফাঁসিয়ে দেয়, এ আতঙ্কে থাকতে হয় আমদানিকারকদের। চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে এখন জরুরি ওয়ানস্টপ সেন্টার। পণ্য শুল্কায়নে বর্তমানে যতগুলো ধাপ পেরোতে হয় এর সবই পুরনো এবং অপ্রয়োজনীয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টেবিলে টেবিলে ফাইল নিয়ে ঘুরতে হয় আমদানিকারক অথবা তার প্রতিনিধিকে।
এ প্রক্রিয়া সহজীকরণের বিকল্প নেই। তিনি জানান, এনবিআরকে একটি প্রস্তাব দিতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার, যেখানে বলা হবে পণ্য শুল্কায়নে যত ডকুমেন্ট লাগবে সব যেন একসঙ্গে গ্রহণ করে কাস্টমস। সব ডকুমেন্ট একসঙ্গে দিলে এক ঘণ্টার মধ্যে ওয়ানডে উইন্ডো থেকে পণ্য খালাস দিতে হবে। টেবিলে টেবিলে ফাইল চালাচালি করে দীর্ঘসূত্রিতা করা যাবে না। কোনো চালানের ব্যাপারে গোয়েন্দা অধিদফতর থেকে পত্র এলে নথিপত্র ও তিন-চারটি চিঠি চালাচালি শুরু হয়। এতে আমদানিকারকদের ১০-১৫ দিন সময় নষ্ট হয়। বন্দরে ওয়ানস্টপ গোয়েন্দা সেবা কেন্দ্র করতে হবে, যাতে তৎক্ষণাৎ পণ্য পরীক্ষা করে খালাসের অনুমতি দেওয়া যায়। বিল অব এন্ট্রির ওপর গোয়েন্দা প্রতিবেদন দিলে আমদানিকারকের অন্তত ১০ দিন সময় বাঁচবে। তিনি বলেন, রপ্তানি খাতে বড় সমস্যা হলো প্রাইভেট আইসিডিতে কাস্টমস অফিসার পাওয়া যায় না। রাতে বাসায় গিয়ে তাদের স্বাক্ষর আনতে হয়। এটা নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাস্টমসের লোকবল না বাড়ালে এ দুর্ভোগ শেষ হবে না। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি, চট্টগ্রামের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম কাস্টমসে সুশাসন নেই। কাস্টমস কমিশনার ভালোমানুষ হলেও তার নিচের কর্মকর্তারা বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম কাস্টমসে এখন দুটো বড় সমস্যা। এক. কাজে দীর্ঘসূত্রিতা। দুই. ইদানীং বিভিন্ন গার্মেন্টের নাম ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার পণ্য আনছে কাস্টমসের সংঘবদ্ধ একটি চক্র। এরা জড়িত বলে এসব ঘটনার তদন্তও হচ্ছে না। পাসবইয়ে এন্ট্রি থাকে না, পণ্য বেরিয়ে যায়।
এসবের সঙ্গে গার্মেন্ট মালিকদের বা কাস্টমসের কেউ জড়িত থাক তাদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি দেওয়া হোক। কিন্তু কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বা এনবিআর কেউই তো ভয়াবহ এ জালিয়াতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ফালতুদের দাপট : অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, কাস্টমস হাউস নিয়ন্ত্রণ করে ‘ফালতু’ নামের কতিপয় বাইরের লোক। কাস্টমস হাউসের প্রতিটি গ্রুপ ও শাখায় চেয়ার-টেবিল সাজিয়ে এদের অফিস করতে দেখা যায় নিয়মিত। কাস্টমসের নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চেয়েও এদের দাপট বেশি। সব কটি শাখায় এরাই দেখভাল করেন গুরুত্বপূর্ণ সব ফাইল। এদের কাছে জিম্মি আমদানি-রপ্তানিকারকরা। অনুসন্ধানে জানা যায়, কোনো বেতন না থাকলেও বহিরাগত এ ফালতুদের প্রত্যেকের মাসিক আয় দুই থেকে দশ লাখ টাকা। এদের অনেকেই দামি গাড়ি হাঁকিয়ে অফিসে যাওয়া-আসা করেন। অবৈধ লেনদেনসাপেক্ষে বহিরাগতরা পারে না, এমন কোনো কাজই নাকি নেই। এদের কারসাজিতে নদী হয় পাহাড়। পাহাড় হয়ে যায় নদী। টাকার বিনিময়ে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্বসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ফাইল দুর্নীতিবাজ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের সহায়তায় বহিরাগতরা গায়েব করে দেয়। বেপরোয়া এসব ‘ফালতু’ প্রকাশ্যেই ঘুষ নির্ধারণসহ ক্ষেত্রবিশেষ আদায় করে কর্মকর্তাদের হয়ে। দিন শেষে তা ভাগ হয় আনুপাতিকহারে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক গ্যারান্টিও এরা গোপনে ফেরত দেয়।
কাস্টমসের নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বদলি হন, কিন্তু ‘ফালতু’ নামে পরিচিত এসব লোক থেকে যায় বছরের পর বছর। অনেকে ১৫-২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন। কাস্টমস হাউসে লোকবলের সংকটের অজুহাতে যুগ যুগ ধরে নিয়োজিত রাখা হয়েছে এদের। দীর্ঘদিনের সংশ্লিষ্টতার কারণে প্রতিটি শাখার নাড়ি-নক্ষত্র এদের নখদর্পণে। ফলে বদলি হয়ে আসা নতুন কাস্টমস কর্মকর্তারা অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েন এ ফালতুদের ওপর। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে নিয়োগ বন্ধ থাকায় চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে অর্ধেকেরও বেশি পদ শূন্য। ফলে জোড়াতালি দিয়ে চলছে দেশের সবচেয়ে বড় রাজস্ব আদায়কারী এ প্রতিষ্ঠান। প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণির ১ হাজার ২৪৮টি মঞ্জুরিকৃত পদের বিপরীতে বর্তমানে লোক আছে ৬০০ জন। শূন্য রয়েছে ছয় শতাধিক পদ। এত বেশি জনবল ঘাটতির কারণে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের শুল্কায়ন, মিথ্যা ঘোষণায় আনা পণ্যের কায়িক পরীক্ষা, অভিযোগের শুনানি, বিরোধ নিষ্পত্তি, রাসায়নিক পরীক্ষা, লাইসেন্স, বন্ড, নিলামসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। স্টেকহোল্ডাররাও নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। পিয়ন, দারোয়ান, ফালতুরাই এ সুযোগে রাজস্ব কর্মকর্তা সেজে বসে আছে।